Categories: Articles in The Daily Newspapers, Tariff41 words0.3 min read

বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুস্পষ্ট নীতিনির্ভর কৌশল, যা মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এ ক্ষেত্রে টিকফাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নীতিগত সংলাপ জোরদার করে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত বিষয়সহ সবকিছু নিয়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমাধান করতে হবে, যেমন- চীনের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান। একই সাথে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল আমদানি এড়িয়ে বিকল্প বাজার খোঁজা, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো ও দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় ভারসাম্য বজায় রেখে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

মো: মহি উদ্দিন

প্রকাশ : মঙ্গলবার, জুলাই ৩০, ২০২৫,

logo

বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিবাচক সংবাদ হচ্ছে- ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ এবং রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৭ শতাংশ, ফলে মোট রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থাকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বস্তির। অন্য দিকে বিশ্ববাণিজ্য দীর্ঘ দিন ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়ার কারণে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেনি; সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককেও শক্তিশালী করেছে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ নামে দেশভিত্তিক একটি পাল্টা শুল্কনীতি ঘোষণা করেন। এই নীতির মূল লক্ষ্য ছিল দেশটির দেশীয় শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা, বাণিজ্যঘাটতি কমানো এবং ‘অন্যায্য বিদেশী বাণিজ্য অনুশীলন’ প্রতিরোধ করা। নীতির আওতায় সবধরনের আমদানির ওপর ১০ শতাংশ হারে সর্বজনীন শুল্ক আরোপ করা হয়। পাশাপাশি যেসব দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, তাদের জন্য আলাদা করে বাড়তি শুল্ক ধার্য করা হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের ওপরও ‘ট্রাম্পোনমিকসের’ খড়গ নেমেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের গড় শুল্ক ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। এতে নতুন ৩৫ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হলে মোট কার্যকর শুল্ক দাঁড়ায় প্রায় ৫০ শতাংশ। নতুন হার যদিও এপ্রিল মাসে প্রস্তাবিত ৩৭ শতাংশ থেকে কম, তবু ভিয়েতনাম যেভাবে আলোচনার মাধ্যমে ২০ শতাংশ শুল্ক নিশ্চিত করেছে, তার তুলনায় এটি অনেক বেশি। নতুন এই শুল্কগুলো আগের শুল্কের ওপর অতিরিক্ত।

অনেকের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি সমন্বয়ের চেষ্টার পরিসংখ্যানগত একটি সমীকরণে জোর দেয়া হয়েছে; কিন্তু এসব বিশ্লেষণ ‘বাণিজ্য ঘাটতি’র বাইরে ট্রাম্পোনমিকসের দু’টি অন্যতম লক্ষ্যকে আমলে নিচ্ছে না। সেই দু’টির প্রথমটি ‘নেগোসিয়েশন’। ট্রাম্প মনে লুকিয়ে না রেখে খোলাখুলিই বলেছেন, ট্যারিফের চাপ সব রাষ্ট্রকে আমেরিকার অধীন সমঝোতার টেবিলে বসতে বাধ্য করবে। চীন এই কৌশলকে বলেছে, ‘ইউনিল্যাটারাল বুলিং’ বা ‘একতরফা মাস্তানি’। যুক্তরাষ্ট্রের সব দেশকে চাপে রাখার কৌশলটি অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার মতো দেখালেও উদ্দেশ্য হয়তো ভূ-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অথবা অপ্রথাগত ব্যবসার বাজার সম্প্রসারণ। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো ম্যানুফ্যাকচারিং বিষয়টি প্রায় পুরোটাই সত্তর দশকে আউটসোর্স করে দিয়েছিল বিশ্বময়। বাণিজ্য ঘাটতিকেই মূল বিষয় ধরে বিশ্লেষণ ‘বিপজ্জনক’। ট্রাম্পোনমিকসের দ্বিতীয় লক্ষ্য- ‘ম্যানুফ্যাকচারিংকে বিদেশ থেকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনা’। দুনিয়া জানে দেশটির অর্থনীতির আরেক নাম ‘ওয়্যার ইকোনমি’। সেই একই দেশ কি সত্যি সত্যিই গেঞ্জি, আন্ডারওয়্যার, রুমাল উৎপাদনে যাবে?

যদি বাণিজ্য ঘাটতিকেই মূল বিষয় ধরি তাহলে, যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখতে হলে আমাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। এখন আমরা কিভাবে খুঁজব কী আমদানি করলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ হবে? কিন্তু আসলেই কি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ উদ্দেশ্য? ট্রাম্পের অর্থপরিকল্পকরা কি বোঝেন না মার্কিন অর্থনীতিকে ডাইনোসরের সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশের অর্থনীতি হবে হাঁস-মুরগির সমান।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক শীর্ষ বড় রফতানির বাজার। USTR এর তথ্য মতে, গত সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রেকর্ড করা হয় ১০.৬ বিলিয়ন ডলার, এর মধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করেছে ৮.৪০ বিলিয়ন ডলার যা দেশের মোট রফতানি আয়ের ১৮ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতি ব্যাপক। মার্কিন পাল্টা শুল্ক নিয়ে আগস্ট মাস থেকে কী হবে তা কারো জানা নেই। যদি আগস্ট থেকে স্থগিত হওয়া শুল্কনীতি কার্যকর হয়, তাহলে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতে আঘাত হানবে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া বাংলাদেশী পণ্যের ৮৫ শতাংশের বেশি তৈরী পোশাক, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধির এই ধাক্কা কেবল তৈরী পোশাক শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর ঢেউ পুরো রফতানি খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ছড়িয়ে পড়তে পারে। তৈরী পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এবং প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতে কাজ করে, যাদের অধিকাংশ নারী। যা বহু সহায়ক শিল্প ও সেবা খাতের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। এই খাতে অর্ডার কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে পুরো সরবরাহ ও সাপোর্ট সেক্টরে।

শুল্ক বৃদ্ধির ফলে যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্ডার কমে যায়, তাহলে প্রথম ধাক্কাটি লাগবে বিভিন্ন কাঁচামাল সরবরাহকারীদের ওপর। পাশাপাশি প্যাকেজিং খাত ও পরিবহন খাতেও স্থবিরতা দেখা দেবে। কম মালামাল পরিবহনের কারণে ট্রাক, কনটেইনার ও জাহাজ কম ব্যবহৃত হবে, যার ফলে কনটেইনার ডিপোতে অদক্ষতা তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে এটি একধরনের ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করবে, যেখানে একটির প্রভাব অন্যটিতে ছড়িয়ে পড়বে এবং এই ধারা চলতে থাকলে উৎপাদন, আয় ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের সঙ্কট দেখা দিতে পারে।

আর্থিক খাতেও এ প্রভাব গভীর হতে পারে। রফতানি-নির্ভর শিল্পগুলো যদি তারল্যসঙ্কটে পড়ে, তাহলে ব্যাংকঋণ পরিশোধে সমস্যা দেখা দেবে। এতে খেলাপি ঋণের হার বাড়বে, ব্যাংকগুলো ঝুঁকিতে পড়বে। একইভাবে বীমা খাতও বিপদে পড়বে। কার্গো পরিবহন কমে গেলে প্রিমিয়াম আদায় হ্রাস পাবে, অন্য দিকে দাবি (ক্লেইম) বেড়ে যেতে পারে। এই বহুমুখী ধাক্কা শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না হয়ে; বরং কাজ হারানোর আশঙ্কা বাড়বে। এতে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বাড়বে, পরিবারে আয় কমবে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, হতাশা ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান চাপকে আরো জটিল করে তুলবে।

শুল্ক নিয়ে টানাপড়েন প্রশমনে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কয়েক দফা আলোচনায় যুক্ত হয়েছে এবং কিছু পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই গ্রহণ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় কৃষি, বিমান চলাচল, জ্বালানি, তুলা, গ্যাস টারবাইন, সেমিকন্ডাক্টর ও চিকিৎসা সরঞ্জামের খাতে যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা দেয়ার কথা আলোচিত হচ্ছে।

এই কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘জিটুজি’ (সরকার থেকে সরকার) চুক্তির মাধ্যমে প্রায় সাত লাখ টন গম এবং ২৫ বোয়িং এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গমের সম্ভাব্য মূল্য ভারত, রাশিয়া বা ইউক্রেন থেকে আমদানি করা গমের তুলনায় প্রতি টনে ২০-২৫ মার্কিন ডলার বেশি হতে পারে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি।

সরকারের এই উদ্যোগগুলো সহযোগিতার ইতিবাচক বার্তা দিলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাণিজ্যিক যুক্তির নিরিখে ভবিষ্যতে এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক উত্থাপিত হতে পারে। তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল গম আমদানি করতে গিয়ে সরকার হয়তো ভর্তুকি দিতে বাধ্য হবে। এর ফলে বাজেট-ঘাটতি বাড়তে পারে কিংবা বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরো তীব্রতর রূপ নিতে পারে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা মানসম্মত হলেও তা ভারত, পাকিস্তান বা ব্রাজিলের তুলার তুলনায় ব্যয়বহুল, যা মূল্য সংবেদনশীল তৈরী পোশাক শিল্পের জন্য উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস করতে পারে।

এ ধরনের সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক বিবেচিত হতে পারে, যদি এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানিতে শুল্ক কমিয়ে আনে বা অগ্রাধিকারভিত্তিক কোনো বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে শুল্কছাড়ের ব্যবস্থা করে। তবে পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক এমন কোনো কাঠামো অনুপস্থিত থাকায় একতরফা তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল আমদানিতে বাধ্য হওয়া বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক ভারসাম্যের অবনতি ঘটাতে পারে। বিশেষত, যদি এর ফলে বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতার ক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে তা বাণিজ্যিক ভারসাম্যে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে টেকসই উন্নয়ন এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্যনীতির মূলনীতির সাথে এর সামঞ্জস্য ‘সন্দেহজনক’ হলেও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব পদক্ষেপ তাৎক্ষণিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সৃষ্টি না করে শুধু বাণিজ্য-বিচ্যুতি ঘটালে জাতীয় সামগ্রিক কল্যাণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুস্পষ্ট নীতিনির্ভর কৌশল, যা মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এ ক্ষেত্রে টিকফাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নীতিগত সংলাপ জোরদার করে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত বিষয়সহ সবকিছু নিয়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমাধান করতে হবে, যেমন- চীনের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান। একই সাথে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল আমদানি এড়িয়ে বিকল্প বাজার খোঁজা, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো ও দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় ভারসাম্য বজায় রেখে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক

Reference: https://dailynayadiganta.com/opinions/opinion/7VeXhH26Tr5I?fbclid=IwY2xjawL3nYpleHRuA2FlbQIxMQABHm_EDjgVELHpLM4NXLyWvFriL9_3vqHJpUuJrPxseaMA-uKxEuqUiHfsPyRq_aem_v3e1ZNQsJmXmDc2ZBRdFww

 

Share This Post, Choose Your Platform!

About the Author: Mohi Uddin

I completed my MBA with a major in International Management from the University of Chittagong, Bangladesh, in 2009, graduating first in my class. That same year, I began my professional journey in the banking sector. Currently, I am serving as an Analyst at NCC Bank PLC, Bangladesh. In addition to my banking career, I contribute as an economic analyst, regularly writing on economic issues for the editorial pages of two prominent Bangladeshi newspapers: The Daily Observer and The Daily Naya Diganta.

Leave A Comment